Saturday, July 29, 2017

জয় জয়ন্তী।।।

জয় জয়ন্তী।।।
জয়ন্তী নিয়ে আমার বেশ ন্যাক আছে।বারবার যাই,একদিনের নামে গিয়ে মিনিমাম ৩দিন।ছোটবেলায় গেছি আবছা স্মৃতি,বড় হয়ে উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে একা একা হপ্তাখানেক। ভয়ংকর ঝড়ে আটকে দোতলার কাঠের ঘরে লন্ঠনের আলোয়।৭দিন বিদ্যুৎ নেই, বালা নদীতে জল,তাই বাস আসছেনা ৩-৪ দিন।অসভ্য জগতের সাথে যোগাযোগ নেই।আমি জয়ন্তী নদী জংগল পার করে একা একা চলে যেতাম ভুটিয়া বস্তি।আড্ডা মারতাম ঘন্টার পর ঘন্টা।এক খুকরি বা কুকরি পেয়েছিলাম উপহার,এখনও বিছানার তলে পুষে রাখা।
তারপর আমি কলকাতাবাসী। খবর পেতাম, রাখতাম জয়ন্তী নামক আজব গ্রামের।পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার অন্তর্গত বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পর এক্ববারে মধ্যিখানে এই গ্রাম।চারদিকে খালি বুনো গন্ধ পাওয়া যায়। মশা বিশেষ নেই তবে সাপ খোপ আছে বিস্তর।গ্রামবাসীরা বলে,ও সব আমাদের ছেলেপুলেদের মত।!!

পর্ব ১
এক বর্ষায় বালা নদীতে জল উত্তাল। সরকারি একটি ই বাস আসে জয়ন্তীতে..সকাল ৯টা নাগাদ..এখনও...সেটি গেল উলটে।তখন মোবাইল ফোন, মেট্রোতে বা এয়ারপোর্ট এ দেখাযেত মোটা চেন বন্দি, পকেট থেকে ঝুলছে।সেই আদিম যুগে জয়ন্তীর মত জায়গায় যোগাযোগ ব্যাবস্থা শুন্য। শুধু যোগাযোগ নয়, বিনোদন ও ছিল শুন্য। সন্ধে হলেই হাতির ডাক, বাঘের ডাক, রাক্ষুসে ঝিঝি আর জনাকয়েক বিহারী পরিবারের খোল কত্তাল নিয়ে রামা হো রামা হো গান.... এই ছিল এন্টারটেইনমেন্ট।
তো সেই আকালের যুগে, টানা কয়েকদিনের ঘোর বর্ষায় জয়ন্তীরর একমাত্র রাস্তা বালা নদী হল বানভাসি।শুধু তাই নয়.... সেই একমাত্র বাসটি গেল নদীতে উলটে!
তোলার লোক নেই, কিন্তু খবর দেবার লোক আছে।বিদ্যুৎ বেগে খবর গেল পৌছে জয়ন্তী বাস স্টান্ডে।
মনস্তাত্ত্বিকগন বলেন,  বিকৃতি বা বীভৎসতা মানুষের আদিম রক্তে বইছে। এতে দোষ নেই।উপকার আছে.... আবার আনন্দও আছে।
জয়ন্তীর মানুষ একটি ট্রাক ভাড়া করল।এক ট্রাক মানুষ চলল বানভাসি বাস দেখতে।এবার সেই বিরাট দলে ছিল ছোট্ট একটি পাখির মত বালক,শিবাজি।আজ সে যদিও এক বেসরকারি ব্যাঙ্কে কর্মরত গোফ দাড়ি ওয়ালা লোক।! যাই হোক...
বালা নদীর দুধারে গভীর জংগল। বক্সার ভয়াল অরন্য।ট্রাকটি অকুস্থানে পৌছে, ঘুরে ফিরে, সাইড সিন ও প্রয়োজনমত সাহায্য করে দলটি ফিরে গেল।..মাঝ রাস্তায় এক আর্ত চিতকারে কেপে উঠল জংগল, থেমে গেল ট্রাক।শিবাজির মা, ও পিশির আর্তনাদ, শিবাজি মিসিং!
এদিকে সন্ধে ঘনায়।ট্রাক দাঁড়িয়ে আবার।জংগলে ছড়িয়ে গেল জয়ন্তীবাসী।কিছুক্ষন পর জংগলে শোনা যায় গুলির শব্দ!! আর আর্তনাদ। " পেয়ারা...পেয়ারা...".
জংগল প্রহরী বন্দুক নামিয়ে নেয়। জংগলে যারা খুজছিল শিবাজি,তারা গেল থমকে। শুধু ঝিঝি পোকার ডাক।হঠাত খচমচ শব্দে জংগল প্রহরীর দল, ধরে আনে শিবাজি।মাথা নীচু,মুখে বিড়বিড়...." পেয়ারা,পেয়ারা।
উতসুক মা পিশি সহ জনতা!   উন্মোচিত হয় শিবাজী" রহস্য।আসলে,  জয়ন্তী ট্রাকে আসার সময়ই গভীর জংগলে শিবাজির চোখে পড়ে এক পেয়ারা গাছ।তাক করে থাকে। বালা নদীর ডোবা বাসের অছিলায় চম্পট দেয় পেয়ারা সন্ধানী শিবাজী।
এদিকে গভীর বর্ষার  জংগলে অজানা শব্দে ভীত জংগল প্রহরী ভাবে,এল বুঝি চোরা শিকারী!! এই সময় গভীরতম অরন্যে একমাত্র চোরা শিকারী আর বন্য জন্তু ছাড়া আর থাকে না কেউ।
ব্যাস...চলল ফায়ার " দুম দুম"
চ্যাঁচায় শিবাজি" আরে আমি পেয়ারা...পে পে পেয়ারা""
গার্ড " তোবা তোবা,,রাম রাম " করতে করতে দৌড়।
কান ধরে হিড়হিড় করতে করতে নিয়ে এল।  মা,  পিশির হাউ মাউ কান্না....। ছাড়া পেয়ে লাল হয়ে গেল লজ্জায়( তখন হওয়া যেত, কোন দোষের ছিল না)
জয়ন্তীতে এরকম হাজারো ঘটনার ঘনঘটা।

পর্ব ২

একবার  জলপাইগুড়ির এক পাড়াতুতো দাদার বিয়েতে গেছি জয়ন্তী।কয়েকশো লোক নিমন্ত্রিত।জংগল মহল উত্তপ্ত।
বিয়ে মিটে গেল ভালভাবেই।মানে...কোন বিরাট গোলযোগ ছাড়াই।শুধু দু একটা বাচ্চা জংগলে হারিয়ে গেছিল...তারা ফিরল বেশ কয়েক ঘণ্টা পর,বিদ্ধস্ত অবস্থায়! বাজুদা, আমার এক জামাইবাবু, বিয়ের দিন, একবেলা ,মানে সকাল থেকে সন্ধে অবধি, বেপাত্তা ছিল...সন্ধ্যাবেলা তাকে এক  অচেনা ট্যুরিস্ট জিপ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। সেই জিপের লোকজন কে আমরা চিনিনা, বাজুদার বক্ত্যব্য ,সেও চেনে না।এমনকি সেই ট্যুরিস্টরাও চেনেনা বাজুদাকে!কেঊ কাউকে চেনেনা,অথচ !!
আমি মাঝরাতে বেপাত্তা হয়ে গেছিলাম,শেষে এক  নিষিদ্ধ আড্ডা থেকে ভোররাতে আমাকে ,বুলকিদি উদ্ধার করে আনে ।
আর বৌভাতের দিন রাতে হাতি এসে বাড়ির পেছনের প্যান্ডেল ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়!বউ বসে ছিল সিংহাসনে একা, আর সব্বাই ভয়ে যে যেদিকে পারে দৌড়ে পালিয়ে গেছিল !ব্যাস এটুকুই !
পরদিন ও নিমন্ত্রিত দের অনেকেই ছিলেন।ছুটি কাটানোর আমেজে আর কি !আমিও তখন চাকরি করি।অফিসে ফোন করে, দাদুর বাতের ব্যাথা, না ঢাকুরিয়ায় বন্যা গোছের কিছু একটা বলে চুপচাপ বসে ছিলাম, কারন ফোন তো আর আসবে না !তখনো জয়ন্তীতে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না ! পি সি ও বুথ ছিল একটাই। সেটাও আবার ওষুধের দোকান, ও পোল্ট্রি ফার্মের সাথে। বেশী জোরে কথা বলা যেত না।চ্যাচালেই মুর্গী গুলো ত্বারস্বরে চেচিয়ে উঠত!
যা হোক...
বৌভাতের  পরদিন রাতে সক্কলে খাওয়াদাওয়া করে যে যার মত শুতে যাবে।বর্ষার রাত,তার ওপর জমজমাট জঙ্গল!টিপটিপ বৃষ্টি,রাত ও প্রায় সাড়ে  বারোটা। হঠাত বাড়ির পাশে একটা ঝোপের মধ্যে সাপের মনি পাওয়া গেল।জ্বলজ্বল করচে!  আমরা ছিলাম বান্টিদাদের বাড়ির দুটো বাড়ি পরে এককাঠের ফরেস্ট বাংলোর ওপর তলায়।
পাশাপাশি বাড়ি, তাই বাড়ির স্যামনেই সব্বাই মিলে আড্ডা হচ্ছিল।শুতে যাওয়ার খুব তাড়া নেই,আর অভ্যেস ও নেই !হঠাত শুনি  চিৎকার আর উলুদ্ধনি !! ভিড় জমে  গেল মুহুর্তে !আমরা বাদে পুরো জয়ন্তীতে তখন মধ্যরাত। সারা গ্রামবাসী চোখ কচলাতে কচলাতে এসেছে সাপের মনি দেখতে।সব্বাই পয়সা ছুঁড়ছে, সাষ্টাঙ্গে প্রনাম একধারসে!
আমি বাপারটা বোঝার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছি।মধ্যরাতে তখন উৎসবের মেজাজ।বান্টিদাদের বাড়ির সামনের একফালি উঠোনে ফুচকার দোকান, ঝালমুড়ি বসে গেল।মহিলারা চান টান সেরে চলে এসেছে।
এই সব ঘটনাই ঘটে যাচ্ছিল দ্রুত বেগে, প্রায় মিনিট ১৫র মধ্যেই!ছোট্ট জায়গা, খবর ছড়ায় বিদ্যুৎবেগেই!
যার বিয়ে, সেই বান্টিদা বরাবরই ডাকাবুকো গোছের, আগেও বলেছি, যে পাগলা হাতির সামনে চলে যায়, নির্ভয়ে!
সে " দেখি ব্যাপারটা" বলে ভিড়টির ঠেলে এগিয়ে যায়!মহিলারা হা হা করলেও পাত্তা দেয় না।
বান্টিইইইইইই বলে আওয়াজ ওঠে রিভার্ব সমেত।এক বয়স্ক গোছের মহিলা এগিয়ে আসেন, " দ্যাখ বান্টি,তোকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি...তুই আমার ছেলের মতই,"
কি হয়েছে বলোনা ! বান্টিদা খ্যেচিয়ে ওঠে!
এই প্রসাদী ফুল, কালিবাড়ির, ... বান্টিদার মাথায় ছুইয়ে দেয়! ভগবান মঙ্গলময়!আজ তুই বিয়ে করেছিস,বড় হয়েছিস"
বান্টিদা আর কথা না বাড়িয়ে সটান ঝোপের মধ্যে এগিয়ে যায়।একটু পর," দূর শালা" বলে এক বিরক্তিকর চিৎকার ভেসে আসে !  
মহিলাদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন ওঠে!
দেখা যায়, ঝোপের ওপর একটা এল ই ডি লাইট রাখা, আর পেছনে চোরের মত দাঁড়িয়ে আছে কুচকুচে কালো পুতুল,বান্টিদাদের বাড়িতে কাজ করত মহা বিচ্ছু এই ছেলেটি !!অন্ধকারে তার দাতগুলো চকচক করছে শুধু !" ইয়ে মানে"...আমতা আমতা করে ওঠে পুতুল।তখন সদ্য সদ্য এল ই ডি আলো বাজারে এসেছে, জয়ন্তীর মত জায়গায় কেউ চোখেই দেখেনি এই আলো।বাজুদা শৌখিন লোক, জংগুলে বিয়েবাড়ি, আর লোডশেডিং এর আতুরঘর বুঝে,নিয়ে এসেছিল। ওটা ওদের জন্য বরাদ্দ বাংলোর টেবিলের ওপর রাখা ছিল।দেখা গেল  ঝোপের ওপর সেই বাতিটাই জ্বলছিল।
বান্টিদা ওর কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পুতুলকে নিয়ে আসে সবার সামনে, জমায়েতের মাঝে!
 মহিলাদের মধ্যে আবার চাপা গুঞ্জন ওঠে!
পুতুল মাথা নিচু করে থাকে। বান্টিদা চেচিয়ে ওঠে, এসবের মানে কি !!!
পুতুল আমতা আমতা করে।
কানটা ধরে জোড়ে মোচড়ায় বান্টিদা।
অ্যাঁ অ্যাঁ করে ওঠে,বলছি বলছি বলছি।
খানিক কেদে,খানিক লজ্জায়,খানিক আমতা আমতা করে পুতুল যা বলল, তা বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, ... রাতে খাওয়ার পর পুতুলের বেদম পায়খানা পেল ! এদিকে সেই বাড়ি, ও আশে পাশের যত বাড়ি আছে, সবার দরজায় দরজায় গিয়ে পুতুল আছড়ে পড়ে, কিন্তু ঘটনা চক্রে সব বাড়িতেই কেউ না কেউ পায়খানাতেই বসে ছিল। বিয়েবাড়ি উপলক্ষে গ্রামবাসীর ভুরিভোজ চলছিল দু দিন ধরে।তারই ফল স্বরুপ এই পর্যায়ক্রমে পায়খানা।মুখের ওপর বন্ধ হতে থাকে একের পর এক দরজা!এদিকে ঝড় উঠেছে প্রবল!খর বায়ু বইছে, মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে চারদিক...।
পুতুল এবার আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে।একছুটে ঘরে চলে যায়।বাজুদার টেবিলের ওপর থেকে এল ই ডি ল্যাম্পটি ছিনিয়ে নিয়ে সোজা ছুটে যায় জংগলের দিকে।
তার পরের ঘটনাকে তো মোটামুটি ইতিহাসই বলা যায় !আর এওর পর পুতুলকে কিই বা বলার থাকতে পারে!সব্বাই ,কিছুই হয়নি এমন একটা ভান করে যে যার বাড়িতে গিয়ে চাদর গায়ে দিয়ে সটান শুয়ে পড়ল!
ভারতবর্ষের মত দেশে পাবলিক টয়লেট অত্যন্তই জরুরী, তা সে জয়ন্তীর গভীর অরন্য হোক বা পার্কস্ট্রিটের মোড় !





পর্ব ৩
একটা ৬ইঞ্চি পাতলা দেয়াল।তার ঠিক  ওপারেই ওর দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।আমি স্থির চোখে চেয়ে আছি হলদে রংচটা দেয়ালের দিকে।আমার ডানদিকে মাম একবার দেয়ালের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার আমার দিকে।পুর্বা আমার জামা শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাপছে,মাম ওর মুখ চেপে রেখেছে বা হাত দিয়ে।
আমি মাথা না ঘুরিয়ে আড়চোখে বাঁ দিকে দেখে নিলাম ভেতরবাড়ি যাওয়ার দরজায় বান্টিদা দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার ডানদিকে কাঠের দরজার একটা পাল্লা খোলা...চোয়াল শক্ত করে খুব ধীরে মাথা নীচু করে বান্টিদা আমায় ইসারায় ডাকল। আমি নড়লেই আওয়াজ হবে,আর একটু শব্দ হলেই.... প্রায় ১২ ফুট উচু দাতাল মদ্দা পাগলা হাতিটা দরজা আর দেয়ালটা জাস্ট ভেঙে ঢুকে আমাদের পিষে ফেলবে।ওই  পাতলা দেয়াল ওর কাছে পিজবোর্ড এর খেলনার মতই।
রাতের খাওয়ার টেবিলেই বসে শুনছিলাম, কাঠের বাংলোর পেছনের জংগল থেকে এই বিচ্ছিরি রকম বড় দাতালটার চিৎকার। শোনা মাত্রই,আধখাওয়া ডিম ফেলে ক্যামেরা নিয়ে ছুটদিলাম বান্টিদার সাথে, জাস্ট ৩-৪ টে বাড়ি পরে, ফরেস্ট গার্ড এর জঙ্গল  ঘেষাছোট্ট কোয়ার্টারে।ওর বাড়ির পেছনের জঙ্গলেই নাকি হাতিটা কলাগাছ খাচ্ছে,,ব্যাটা জাস্ট দিন দুয়েক আগেই এক বুড়িকে তার ঘর ভেঙে ঢুকে পা দিয়ে থেঁতলে মেরে, চাল খেয়ে পালিয়েছে....বড্ড জ্বালাচ্ছে নাকি এই দাঁতাল!!
এ হেন সু সময়ে আমি আর বসে ডিম খাই কি ভাবে!!
কিন্তুগভীর অন্ধকারে,বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি মাম আর পুর্বা হাত ধরাধরি করে ঠিক আমাদের পেছনেই আসছে..হাতি দেখব,হাতি দেখব,.. বলতে বলতে। আমাদের,, কি আর বলব,,, জাস্ট  গা জ্বলে গেল।কিন্তু তখন আর পেছন ফেরার উপায় নেই,চারদিকেই তো জংগল,...
  ওদের নিয়েই,পায়ে পায়ে ওই  নির্দিষ্ট কোয়ার্টার এর পেছনের উঠোনে পৌছে গেলাম।উঠোনের ওপারেই ঘন জংগল।ওইখান থেকেই মসমস শব্দ ভেসে আসছে....কেউ একটা যেন ফুঁসসছে রাগে...
 ওই ফরেস্ট গার্ড আমাদের দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগার!!উঠোনের দিকের দরজা বন্ধ রেখে জানলা একপাটি খুলে উনি উকি মারছেন। হাত দিয়ে ইসারায় উঠোনে হাতি পালান পালান.বলার চেষ্টা ... খুব সন্তর্পনে একপাটি দরজা একটু ফাক করে খুলে হাত দিয়ে দ্রুত ইসারায় ভেতরে চলে আসতে বললেন। আমরা দ্রুত দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই টের পেলাম পেছনে কালাপাহাড় তেড়ে আসছে ঝোপঝাড় ভেঙে!!!!!  আমরা ঘরে ঢুকেই বাঁ দিকেই দাঁড়িয়ে পড়লাম হতভম্বের মত!! বান্টিদা এক দৌড়ে ভেতরঘরের দরজা দিয়ে ভেতর বাড়িতে চলে গেল গার্ডের সাথে।আর ওই কালাপাহাড় এসে দেয়ালের ওপারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর পা দিয়ে মাটি ঘষতে লাগল ক্রমাগত....
আমরা ঘরে ঢুকে, বাঁ দিকে গিয়েই,পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম...... বুঝলাম,বিচ্ছিরি এক ভুল করে বসেছি!! এবার আর কি....স্টাচু হয়ে থাক আর কি!!!
এক একটা মিনিট মনে হচ্ছে এক বছর....
৬ ইঞ্চি দেয়ালের ওপারেই মৃত্যু!!!  আর এপারে আমরা ৩ জন আর খান ২০০ মশা!!
এভাবে হাতিটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে পড়ল বোধহয়... আমার দিকে ২০০ মশা হলে ওই ব্যাটার দিকে তো হাজার খানেক হবেই...আর সে  সব রাক্ষুসে মশা...হুল ফুটিয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে সমানে...
আর তা ছাড়া,দেয়ালের আড়ালে থাকাতে ও ব্যাটা কিছুতেই আমাদের দেখতেও পাচ্ছে না, আর সাড়া শব্দ না পেয়ে আরও বিরক্ত.... কিন্তু বিরাট ভাগ্য যে গত দিনের মত ওনার দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হয়নি....বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর,একবার  জাস্ট ভীষণ  জোরে হুংকার দিল ।মাম এবার কেপে  চিৎকার দিয়ে উঠল,সাথে পুর্বাও......।আর প্রায় সাথে সাথেই  আমি মাম আর পুর্বাকে দুহাতে চেপে ধরে এক ছুট দিলাম ভেতরবাড়িরর সদর দরজার দিকে....যাওয়ার সময় এক ঝলক ডানদিকে তাকিয়ে,পাতলা কাঠের হাফ খোলা দরজার ওপারে অন্ধকার জংগলের মাঝে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় দুটো লাল বিন্দু জ্বলতে দেখলাম।।প্রবল জোরে মাথা ঝাকিয়ে উঠল সে...আবার এক চিৎকারে রাতের বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট কেপে উঠল!!!
তারপর দেখি আস্তে আস্তে ধুলোর ঝড় তুলে, রাতের অন্ধকারে,গভীর  জংগলে মিলিয়ে গেল দাতালটা।
#পুনশ্চ : এই পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে মিনিট ৫ এর মধ্যে....আর পুরোটাই আমার ক্যামেরা বন্দী করা আছে !!!  অনেকেই দেখেছে ভিডিওটি!! কিন্তু আমাদের তখন মনে হয়েছিল বোধহয় ঘন্টা খানেক ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
কিন্তু ওখানেই শেষ নয়....হাতি শেষ রাতে আবার ফিরে এসেছিল আমাদের কাঠের বাংলোর নীচে দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্প করে গেছে....
তখনও আমি বাইরে........হাতির পেছনে....ক্যামেরা হাতে!!!!
তবে মাঝরাতে ফিরে এসে ওই আধ খাওয়া ডিম টা কিন্ত আর খুজে পাইনি কোথাও!!

পর্ব ৪
সাম্প্রতিক জয়ন্তী যাত্রার গপ্পে আসি এবার।
রাত ঠিক আড়াইটে।ঝমঝম করে বৃষ্টি। জয়ন্তী নদীর রিভারবেড সাদা এক ফালি কাপড়ের মত পড়ে আছে।বিরাট কাচের স্লাইডিং জানলায় বসে আছি।সামনে একফালি সিমেন্টএর উঠোন,তার পরেই নদী। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে জংগল আবৃত সারি সারি পাহাড় আর তার চুড়ায় জমে থাকা মেঘের দল উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।জমাট ঠান্ডা বাতাসে গা ছমছম করে ওঠে।এই ছোট মায়াময় বারান্দায় পৃথিবীর সব ভাললাগা এসে থমকে আছে।বাকীরাও চুপচাপ।কথা বলছেনা কেউই....কিন্তু জেগে রয়েছে সবাই।ভুটান পাহাড় থেকে আবছায়া  হাতির ডাক ভেসে আসে।জংগল গন্ধ ছাপিয়ে বোটকা গন্ধ হঠাত প্রকট। কে জানে কি এলো জল খেতে? মাঝরাতের জয়ন্তীর কুকুর গুলো ডেকে ওঠে তারস্বরে।চারদিকের জংগল বড় মায়াময়।বিরাট বিরাট কালো কালো গাছগুলো সারসার দারিয়ে।মেঘের আবছা আলোয় পাহাড়ের ওপারটা আবার ঝলকায়।আকাশ লাল হয়ে রয়েছে ওদিকটায়।
সরকারি এই বনবাংলো ভয়ংকর সুন্দর! আমাদের বিবাহবার্ষিকীর রাতের নিমন্ত্রণ ঘটনাচক্রে,মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত,  নদীর ঠিক মুখোমুখি জংগলের ঠিক গায়েই, বাংলোর এই ঘরে,নাম উল্লেখ করতে পারব না,এমন এক  খাটি উত্তর কলকাতার আড্ডাবাজ দাদার পরিবারের সাথে।
কেউ বসে আছে মায়াবী মদ হাতে।নেমে গেল ধাপে ধাপে সাদা ভেজা ঠান্ডা বালির চুমুতে।কেউ গিটার হাতে আধ ঘুমে প্লাক করে যায় ঝিম ধরা সুর,যেটা বৃষ্টির মতই নেশা ধরায়।গান তার আকাশ ছুঁয়ে পৌছে যায় ভুটান পাহাড়ের চুড়ায়...
চোখ জ্বালা করছিল,এখন সেই জ্বালা কেটে, বেপরোয়া রাতজাগা।
মাঝরাত পার হলে, থেমে গেল বৃষ্টি। পাহাড় চুড়ো দেখা যায়, লেপচাখা।ভোর হবে এবার।
পরদিন সারাদিন ঘোরাঘুরি কোন টাওয়ার...কত আয়তন, কত বর্গকিমি , অতশত জানিনা ।জংগলের মধ্যে  গাড়ি থামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরছিল বারবার ।আর তাতেই নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল সব্বার।ভারী শ্বাস।সেটা আমাদের না, ঘাড়ের ওপর উকি মারা হাতির ,তা শুভই বলতে পারবে।অনন্যা এর আগেও আমাদের সাথে কাজের সুত্রেই জংগলে ঘুরেছে বারবার।গুড্ডুও তাই। অরিজিত অবশ্যি আমাদের দলে নতুন।তাও বেশ উতসাহী।আর আমি তো বিগত ৩-৪ মাস ধরে জংগলের বাসিন্দাই হয়ে গেলাম।তাই এটাই আপাতত আমার ঘরবাড়ি বলা যায়।আমার না বলে আমাদের বলাই ভাল।জংগলের নেশা যে কি ভয়ঙ্কর,তা আগে এতটা বুঝতে পারিনি। এ এক ভয়ঙ্কর প্রেম, ভয়ানক টান।
পর্ব ৫
চোখ টোক কোনরকমে খুলে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।কানের পাশে চ্যাঁ চ্যাঁ করে বিচিত্র বিচিত্র পোকার আওয়াজ।গুড্ডু আমার পাশেই খুব সিরিয়াস মুখ করে আছে মনে হল,কারন এই আলকাতরার মত অন্ধকারে নিজের হাতও দেখতে পাচ্ছি না,তো ওর মুখ দেখব কিভাবে??জয়ন্তীর জংগলে সারাদিন অনেক রোমান্টিক ট্রিপে ছিলাম, সেটা লিখেওছি আবেগ ভরে,কিন্তু এই রাত বারোটা সময় গভীর জংগলের মাঝে দুইজনের অ্যাডভেঞ্চার অভিযান পর্বটা বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে গেল।
চারদিকেই তো জংগল।গপ্পো করতে করতে চলে এসেছি,কিন্তু যখন হুশ হল তখন শুধু নিশ্বাস নয়,তার সাথে,হজম হবার শব্দ,শিরা দিয়ে রক্ত বয়ে যাবার শব্দ, হৃদস্পন্দনের শব্দতো বটেই,সব একসাথে শুনতে পাচ্ছিলাম।
পেছনের দিক থেকে মড় মড় করে আওয়াজ এল।ডালপালা ভেঙ্গে কিছু একটা আসছে।!!আবার থেমেও গেল ।
 শুভর বাইকটা বাবা বাছা বলে হাতে পায়ে ধরে বাগিয়েছিলাম।এই জংগলে,এই রাতে,জয়ন্তীর মত জায়গায় একখানি বাইক পাওয়া মানে পাড়ার মোড়ে দিপিকা পাদুকন কে পেয়ে যাওয়া!!
অনেক কাকুতি মিনতির পর ও শেষে কড়াভাবে নিদান দিল"খবর্দার জংগলের দিকে যেও না "...তারপর ভয়েজটা এক দাগ নামিয়ে ,"প্লিজ"।
তখন আমরা কিং অফ জঙ্গল। কোথায় হাতি...কোথায় বাঘ?? আমিই হাতি...আমিই বাঘ।
গুড্ডূ আমার অ্যাডভেঞ্চার পার্টনার, ওর ও ভয়ডর বিশেষ নেই। এক লাফে চলে এল আমার সাথে।বেশ কিছুদুর আসার পর ,কি মনে হল বাইকের লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে দেখি...বাপরে !!! এবার বাইক স্টার্ট করতে গিয়ে দেখি...ব্যাস ... ...বার কয়েক ঘ্যা ঘ্যা করে চুপ।আমাদের মনে হল এটা বাইক না...   অ্যাকচুয়ালি আমাদের হৃদস্পন্দনই বন্দ হল।বা জীবনের চাকাও বলা চলে!!চারদিকে অন্ধকার গলা চেপে ধরছে।কি যে বিচ্ছিরি রকম অভিজ্ঞ্রতা, কি বলব !! ব্যাস দুজনে গুম হয়ে বসে আছি।গুড্ডুর ও গলা দিয়ে বিশেষ আওয়াজ বের হচ্ছে না।মাঝে মাঝে পেট ডাকছে,ক্ষিদেতে। তারপর রাক্ষুসে মশাগুলো পালে পালে প্যা প্যা করে চলেছে চারদিকে !!
এর ...শেষটা আর মনে নেই।শেষ অবধি বোধহয় আর ফিরতেই পারিনি বোধহয়  !!

Wednesday, July 26, 2017

চিত্রকথা ২

খুব বৃষ্টির মধ্যে কখনও গভীর জংগলে গিয়ে দাড়িয়েছেন?চারদিকে ঝাপসা হয়ে যাওয়া সবুজ গলে গলে নেমে আসে  খয়েরী গাছের গা বেয়ে বেয়ে। হাওয়ার আওয়াজ প্রথমে শোনাই যায় না!কিছু শুকনো পাতায় প্রথম বৃষ্টির আওয়াজ ,তারপর ঝুপ ঝুপ করে একঘেয়ে পড়তে থেকে অনবরত।বড় বড় ঘাসগুলোর ফাঁক দিয়ে জলস্রোত একেবেকে যেতে যেতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।একটু দূর থেকেই বোধহয় ছোট জলস্রোতের শব্দ পাওয়া যায়,বোধহয় কোন ফ্লগু নদীরই হবে!এদিক ওদিক তাকিয়েও কোথাও চোখে পড়ে না কোন নদীর স্রোত।খালি পেছনে বাঁদিকে গাঢ় সবুজ,একটু দূর গেলেই কালো হয়ে আছে।আকাশ ঘোর অন্ধকার।বৃষ্টির বেগ বাড়লো বোধহয়।সামনে ডানদিকে ঘাসবন ছাপিয়ে নেমে গেছে  ঢালু পাড়,বেশ খানিকটা, তারপর বিদ্যুতের ফেনসিং।বেশ কিছুটা দূরে চোখে পড়ে সল্ট পিট।এই ঘোর বৃষ্টিতেও কয়েকটা বাইসন সাদা মোজা পায়ে নুন চাটছে একা একা।চারদিক ঘন অরণ্য অন্ধকার। 
ডানদিকে বিশাল বাংলো দাঁড়িয়ে আছে। বা দিকে নজরমিনার।বৃষ্টি টিপ টিপ।
আমরা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জিপ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ি।ভিজতেই থাকি অনবরত।ট্রাইপডে রাখা ক্যামেরাও ভিজতে থাকে। যা থাকে কপালে !!অভিষেক দৌড়ে চলে যায় বৃষ্টির মধ্যেই  জংগলের দিকে  অনেক দূর।ওর হাফ প্যান্ট পড়া পা দুটো কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়।মৈনাক গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা গাছের নীচে।আমিও জিপ চলা রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর দিয়ে হাটতে থাকি একা একা।একটু পরেই মাথা নীচু করে চোখে পড়ে, আমি আর একা নই, আমার সাথে গোটা ৩নেক জোঁকও হাটছে আমার পায়ে চেপে!!
একদৌড়ে চলে যাই নজরমিনারের দিকে।আমার পেছন পেছন মৈনাক,আর অভিষেক।নজরমিনারটি প্রায় তিনতলা বাড়ির সমান উচু।
ওপরে উঠে গেলে,বহুদুর অরণ্য চোখে পড়ে।বিরাট গাছগুলোর পেছনে হালকা নীল ভুটান পাহাড়। অঝোর বৃষ্টিতে প্রায় ঝাপসা 
অতদুর চোখ যায় না।নাকি চালসে পরছে চোখে,কে জানে?
ক্যামেরা নিয়ে বোকার মত তুলতে থাকি  এই বৃষ্টি ভেজা জংগল,যদিও জানি,এই অনাঘ্রাত অরন্য আর ঝিম ধরা বৃষ্টি র ঘোর, বন্দী করার হ্মমতা এই নির্বোধ ক্যামেরার নেই। 

কাঠের ঘোরান সিঁড়ি বেয়ে মচমচ শব্দ করে উঠে আসি বাংলোর দোতলায়, ভেজা রেলিং এ হাত রাখি। ততহ্মনে রেঞ্জার বাবুর সৌজন্যে গরম চা চলে এসেছে।সাথে মেরি বিস্কুট। 
ওদিকে, বাইসনের পাল ও দল ভারী হয়েছে।চার জন থেকে এখন দশ বারো জনহবে।   বৃষ্টি কিন্তু হয়েই চলেছে ক্রমাগত। 
আমার পায়ে ইতিমধ্যে খান তিনেক ফুটো হয়ে,রক্ত ঝরছে সমানে।
বাংলোর কেয়ারটেকার, সুতীর কাপড় পুড়িয়ে নিয়ে এলেন।তার ছাই, নিজের হাত দিয়েই লাগিয়ে দিলেন ওই জোক আক্রমনের হ্মত স্থানে।এটা জংগলমহলের টোটকা। 
অভিষেক খাস  দক্ষিণ কোলকাতার,গড়িয়ার ছেলে।,জোক তো দূরে থাক,কেচো অবধি দ্যাখেনি! ওই সব দেখে,প্রথমে বেশ খানিকটা আনন্দ পেলো,তারপর  ওই রক্ত ফক্ত দেখে,একটু ঘাবড়ে গেল।শেষে বিষম ভয় পেয়ে খানকতক মেরি বিস্কুট খেয়ে,দোতলার বারান্দার এক কোনার চেয়ারে গিয়ে বসে রইল।
মৈনাক পেশাগত ভাবে সাউন্ড ডিজাইনার হলেও আমার কাজের হ্মেত্রে মডেল হিসেবে কাজ করছে।সারাহ্মন ধরে ছোট্ট একটা ফাউন্ডেশন কিট আর আয়না নিয়ে ৫ মিনিট পর পর মুখ দেখে বেড়াচ্ছিল।আমার ওই পরিমান রক্তপাত দেখে,ঘামতে ঘামতে,ওর মেক আপ গলে ভুত। ফ্যাকাসে মুখ করে বলল,"ইয়ে দাদা, আমি আর ওই জংগলে যাচ্ছি না।আজকের মত প্লিজ প্যাক আপ কর।"
আমি ব্যাজার মুখে বসে রইলাম।বৃষ্টি র বেগ আর ও বাড়ল। ঘোর বর্ষা চলছে,তার মধ্যেই ৭-১০ দিন ধরে, এই শ্যুটিং। গভীর থেকে গভীরতম অরণ্যে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। পাহাড় থেকে জংগল, বৃষ্টি তে চরে বেড়াচ্ছি, অনেকটা রাস্তা হারানো ছাড়া গরুর মত।
চাপড়ামারি অভয়ারণ্য মানুষের পায়ে হেটে চলার জন্য একদমই নয়।
পেটের দায়ে অনেককে অনেক কাজে নামতে হয়,আমরা তো শুধু হাতি,চিতাবাঘ,জোক,সাপ, ভালুক,নেকেড়ে,হায়না( দু চারটে ভ্যাম্পায়ার ও থাকতে পারে,আমরা আর কতটুকুই বা জানি!!) ভরা বৃষ্টি ভেজা অরন্যে এক রাম ভীতু মডেল,আর ও ভীতু  কলকাত্তাই সহকারী পরিচালক, (আর বাকী টিম মেম্বার দের কথা আর বললামই না,কারন তারা জিপ থেকেই নামেনি!!!) দের নিয়ে ৩- ৪ মাস ধরে এই তথ্যচিত্র তুলছি।পশ্চিমবাংলার উত্তরাঞ্চলের বেশকিছু অরণ্য চরে বেড়ানোর সুবাদে,বর্ষায় সবুজের রঙ মিলাচ্ছি। ক্যামেরায় উঠছে সামান্যই, মনে থেকে যাচ্ছে অনেকটাই।কিন্তু  আজ বোধহয় শ্যুটিং বন্ধ হল।এই বৃষ্টি আজ আর থামবেনা।ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধ্যা। আকাশে মেঘ থাকায়,আরো অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ।মাঝে মাঝে নাম না জানা পাখি উড়ে চলে যাচ্ছে বাঁ দিক থেকে ডান দিকের গভীরতম অরণ্যে।ঝিঝির এক ঘেয়ে ডাকে দু চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।মৈনাক আর অভিষেক কাঠের বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে বসে জাস্ট ঘুমিয়ে পড়ল।বাইসন গুনতে গুনতে আমারও চোখ বুজে এল।

ওখান থেকে আমরা চলে গেলাম গরুমারার দিকে।সে অবশ্য অন্য গপ্পো। 

বৃষ্টি ভেজা অরণ্য ভ্রমণ, এত সমস্যা হলেও,অপুর্ব এক দৃশ্যপটের জন্ম দেয়।বর্ষায় যদিও জংগল বন্ধ থাকে,তবুও বাফার জোন বা জংগল আর লোকালয়ের মধ্যবর্তী এলাকায় ঘোরার অনুমতি মেলে।সেখানে পালে পালে জোক নেই,জন্তুজানোয়ারের অত্যাচার নেই।নিশ্চিন্তে একটি ছাতা নিয়ে জংগলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন চুপচাপ

ভয়ে ভয়ে ভুটানঘাট


ভুটানঘাট পাহাড়  বক্সার গভীর জংগলের শেষপ্রান্তে।ভর সন্ধেবেলায় ওই জংগলে ঢোকা অত্যন্তই বাড়াবাড়ি বলে ধরা হয়।অ্যাকচুয়ালি জনমানবশূন্য বক্সার অরন্যের এই প্রান্তে যে কোন সময়েই ঢোকা একটু বাড়াবাড়ি.... 
বাড়াবাড়ি মানে,বুঝতে পারলাম,যখন ফরেস্ট রেঞ্জার  চোখ কপালে তুলে ছোটমামার মুখের দিকে অনেকক্ষণ হা করে তাকিয়ে থেকে শেষে মুখটা যতটা সম্ভব সিরিয়াস করে গম্ভীর গলায় বললেন,আপনি জানেন... এই জংগলে লেপার্ডের অত্যাচার কিরকম বেড়ে গেছে?
ছোটমামা অম্লানবদনে উত্তর দিলেন,সেটা কি আমার জানার কথা,!রেঞ্জার এবার আমার,মামের আর পুষার মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্তই বিরক্ত মুখে খেচিয়ে উঠলেন, আরে মশাই আমরাই এই সন্ধের মুখে ওই জংগলের রাস্তা মাড়াই না,আর আপনি এই মহিলাদের নিয়ে.....!!তা ছাড়া,এটা হাতিদের বের হবার সময়.... 
ছোটমামা অম্নানবদনে বললেন,আমি তা হলে ডি.এফ.ডি কে.......

রেঞ্জার মুখ ফিরিয়ে নেপালি এক ফরেস্ট গার্ড কে ডাক দিলেন বিরক্ত মুখে!
গার্ড এসে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগল।নেপালী ভাষায় রেঞ্জারকে হাত পা নেড়ে তীব্রবেগে কি সব বোঝাবার প্রবল চেষ্টা করল।
পুষা গজগজ করতে করতে মামকে বলল,বউদি তুমি বাবাকে বল না....মাম দেখি খুব একটা পাত্তা দিল না।
একটু পর দেখি ওই গার্ড অত্যন্ত বিরক্ত মুখে পিঠে এক ঢাউস বন্দুক ঝুলিয়ে হেলতে দুলতে চলে এল।
এবার আমার অবাক করার পালা।আমি গার্ডের হাতে পেল্লায় এক ট্রাইপড ধরিয়ে দিয়ে বললাম,এবার বন্দুকটি সরিয়ে এটা নিয়ে চলুন।
বাইক স্টার্ট দিয়ে ওকে পেছনে বসতে ইশারা করলাম।মাম আর পুষা ততক্ষনে ছোটমামার বাইকের পেছনে বসে পড়েছে। সুর্য তখন অস্তগামী।
সামনের ঘন জংগলের রাস্তায় অন্ধকার মিশে গেছে কালচে সবুজে।গাছে গাছে বানরের কান ফাটানো আর্তনাদ,  আমরা এগিয়ে চলেছি সরু রাস্তা দিয়ে,দুপাশে ঘন অন্ধকার অরন্য।বাইকের হেডলাইট জালিয়ে দিতে হল।পড়ন্ত বিকেলের অল্প আলোয়, গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে গাঢ় নীল ভুটান পাহাড়ের রেখা।
আমার পেছন থেকে গার্ড মশাই ক্রমাগত বলে চলেছেন,দাদা এই সময় আমরা কক্ষনও এদিকে আসিনা...এখন বাঘ জল খেতে আসে তো!! হাতির পাল নেমে আসে ভুটান পাহাড় থেকে।
আমার হাতটা একটু কেপে গেল এটা শুনে!!!কাঁপবেই না কেন রে বাবা!!!
ভালয় ভালয় এই শ্বাপদশঙ্কুল শ্যুটিং শেষ হলে হয়!!! 
বেশ কিছুদুর জংগল পার হবার পর একটা মড়া নদীর বালির চর পার হলাম।ওপারেও ঘন জংগল।বা দিকে দেখতে পেলাম নদীর চরার ওপর একটা ভাঙ্গা ব্রিজ। গার্ড বাবু শীতকালে বাতাস করার মত দৈববাণী করলেন,ওপারের জঙ্গলে আলফা জঙ্গিদের ডেরা,ওই ব্রিজটা ওনারাই বোম দিয়ে একটা আর্মি ট্রাক সমেত উড়িয়ে দিয়েছেন!!
ততক্ষনে আমরা ওপারের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার জঙ্গলে ঢুকে  পরেছি।ঘরে ফেরত পাখিদের ডাকও এখন থেমে গিয়ে শুধু রাক্ষুসে ঝিঝির ডাক,আর অজানা জন্তুজানোয়ারের অদ্ভুত সব ডাক,যা জন্মেও শুনিনি।ফুট দুয়েক চওড়া বালি পাথর ছড়ান রাস্তায় দুপাশেই ঝুকে পড়ছে ঝোপঝাড়। ছোটমামা চোয়াল শক্ত করে স্থির চোখে রাস্তায় চোখ রেখে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরে আছেন।রাস্তা সমানে বাক নিয়েই চলেছে....আসলে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের এখন খুব একটা উপায়ও নেই!!কারন ফিরতে হলেও এই ঘন জঙ্গল দিয়েই অন্ধকার ভেদ করে ফিরতে হবে, ভুটানঘাট নাদেখেই....অগত্যা।
আমরা জাস্ট দম আটকে এগিয়ে চলেছি বক্সার ভুটানঘাট পাহাড়ের প্রান্তে।অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসছে!!

মেঘের গায়ে জেলখানায়

গান বাজছে দূরে  কোথাও।অচেনা পাহাড়ি গান।জংগলের মাঝে একেবেকে রাস্তাটা উঠে গেছে গভীরতর জংগলে।পাহাড়ি জংগল,তাই বুনো চিতাবাঘ চলেএলে চট করে পালানো মুস্কিল।গ্রাম থেকে একটা সরু রাস্তা একজনের বাড়ির ভেতর দিয়ে জংগলে নেমে গেছে।আবার উঠে গেছে একটা পাহাড়ি ঝোরা পার করে।গানটা মিলিয়ে গেল, আস্তে আস্তে।আমরা ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছি এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে।চিতাবাঘ একটা, খুব জালাচ্ছে গ্রামবাসীদের।তবে চট করে দিনেরবেলা সামনে আসে না।ওরাও ভয়পায় মানুষকে বড়ই। এটা বুড়োচিতা। শিকার ধরতে না পেরে,গ্রামে ঢুকে হাস মুরগি নিয়ে যাচ্ছে।
একটাই রাস্তা উঠে যাচ্ছে পাক খেয়ে খেয়ে। একা মানুষ চলতে পারে,এমন পাকদণ্ডি। ডানদিকে বিভিন্ন বুনোফুলের ঝোপ।অচেনা গন্ধ।

অনন্যা, তিব্বতে টিনটিন এর ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মত প্রথমে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিল।বেশ পেছনে,আমি আর ছোটমামা এদিক ওদিক চলছি,ক্যামেরা অন করে,।
একটু বাদেই হাপিয়ে পড়ে, ধপ করে বসে পড়ল একটা উচু বাকের মুখে।আমাদের গাইড বাবু মিটিমিটি হাসছেন!!
বক্সা ফোর্ট থেকে লেপচাখা যাওয়ার প্রায় ৮ কিমি রাস্তায়,পুরোটাই জংগল। পাহাড়ি,ট্রেকিং রুট।তবে জন্তুজানোয়ারের একটু উপদ্রব আছে।সাবধানে চললে অবশ্যি আমাজনেও ভয় নেই।
আমাদের সাথে, এক মালবাহক  শ্যুটিং সামগ্রী নিয়ে উঠছেন,নিশিন্ত মুখে।ওনার কোমরে কুকরি গোজা।মুখে মিষ্টি হাসি।
আমরা ক্রমাগত উঠেই চলেছি রাস্তা বেয়ে বেয়ে।অনন্যা এরই মধ্যে বিভিন্ন বাঁকে,  শট দিচ্ছে হাসি মুখে। শট শেষ হলেই,একলাফে গাইডের পাশে চলে এসে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে,চিতার হলুদ ছোপের ঝলক নেই তো আশেপাশে ??
নেপালী মহিলা, কাধে সবুজ পাতার বোঝা নিয়ে নেমে আসছে হাসিমুখে।এদের সব্বার মুখে হাসি।বোধকরি, চিতাটাও হাসিমুখে দাঁড়াবে।।
লেপচাখা পৌছালাম দুপুর পার করে।পাহাড়ের ওপর বাটির মত একরত্তি এক তিব্বতি গ্রাম।দূর থেকে দেখা যায়, হলুদ লাল পতাকা, তিব্বতি গুম্ফার চুড়া থেকে নেমে এসেছে সার সার।
দু একটা হোম স্টে।ব্যাস।লোকজন প্রায় নেইই বলতে গেলে।গোটা দশেক বাড়ি ঘর।একটা গুম্ফা,একটি দোকান।ব্যাস।
পাশেই ছোট্ট দোকানে পাহাড়ি মদ রস্কি,ছুরপি,মধু,আর পিতোরা,।ঝিম ধরা পাহাড়ি মেঘলা দুপুর।ছোটমামা কাঠের বেঞ্চে বসে, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজলেন।
অনন্যা কয়েকটি নেপালী বাচ্চার সাথে বেদম ঝগড়া করে,শেষে ক্লান্ত হয়ে মেঘের মধ্যে এক বেঞ্চে বসে পড়ল।
হ্যা.... মেঘের মধ্যেই বেঞ্চটি ছিল রাখা।খাদের ধারে একেবারে।অনন্যা মিলিয়ে গেল।
চারদিক হঠাত শুনশান হয়ে পড়ল।
একটু বাদে.....
ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামল।আমিও ক্যামেরা বন্ধ করে, খাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।
পেছনে গুম্ফায় শুরু হল  গম্ভীর গলায়,তিব্বতি মন্ত্রপাঠ।

Friday, January 27, 2017

।।কল কথা।।
     পর্ব-৬

আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি। অফিসের সামনের রাস্তায় জল জমছে আস্তে আস্তে।আমার টেবিলের বাঁ দিকে ছোট্ট জানলা। চারতলার নীচে ছোট্ট এক ফালি জমি,পাচিল, তার পরই চওড়া রাস্তা চলে গেছে ম্যাক্সমুলারের সামনে দিয়ে।বৃষ্টির বেগ বাড়াতে কাচ ঝাপসা হয়ে এল।আমি মিন্টো পার্কের বৃষ্টি দেখব বলে,বিজনদার ক্যান্টিনে ছুট দিলাম।তখন ভয়াবহ কাজের চাপ,রাত প্রায় ১টা বাজে।চ্যানেল আইডি র কাজ চলছে।দেবাদা ঠায় বসে রয়েছেন এক প্রান্তে।। চ্যানেল হেড এলে সাধারণত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ানই ভদ্রতা....কিন্তু দেবাদা এলে কারো খেয়াল ই হত না, কে এল কে গেল....অসম্ভব ভাল এক মানুষ। কাজেরও।
আর এই দেবাদা আমাদের মাথা।খুব একটা নিয়ম কানুন চাপিয়ে দেবার লোক নয়...আমরাও সুযোগে খ্যাপামি করতাম তেড়ে।
ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি,মধ্যরাত ,দুজন বসে চুটিয়ে প্রেম করছে,জানলা খুলে বৃষ্টি দেখব বললে,জাস্ট ক্যেলিয়েই দেবে।নামটা বলব না....এখন ওনারা প্রতিষ্টিত।তবে কি প্রতিষ্ঠিতরা প্রেম করে না!! করেই তো,প্রাতিষ্ঠানিক প্রেম।আর আমি বলছি গোপন প্রেম!!
ছিটকে ফিরে এলাম।প্যাসেজে ঘুরঘুর করছি...আকাশে তখন সুন্দরীর ছড়াছড়ি।. হঠাত বান্ধবীর  সাথে দেখা।
প্যাকেট দেখিয়ে বলল,চল,ফুকে আসি।
আমি বললাম,যাচ্ছি,বাট বৃষ্টিতে ভিজে  নীচে জল দেখতে যাব। রাস্তার ওপারে...
...আমরা পুরনো অন্ধকার সিড়ি বেয়ে নেমে এলাম।স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলার দেয়াল বেয়ে জল নামছে।নিকষ অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে, ঘুলঘুলি দিয়ে আলোয় পরের ধাপ গুলো আন্দাজ করছি।
বাইরে ঝমারে বৃষ্টি হয়েই চলছে।আমরা সিগারেট ধরিয়ে হেটে চললাম.... বেগবাগান জলে ডুব।শুনশান মধ্যরাত।সাদা হয়ে আসছে,ঝাপসা হলুদ বৃষ্টি রাত।সিগারেট ভেসে গেল। ওভারব্রিজের নীচে দাড়ালাম।সাদা লা মার্টিন এর বাড়িটা আউট ওফ ফোকাস। মাথায় ঘুরছে সৌমিত্রদার স্কেচ গুলো।মধ্যরাত পার করে সৌরভদা রা টলোমলো পায়ে ফেরে,এই রাস্তাতেই,বাস না পেলে...পায়ে হেটে,পুলিশ বাচিয়ে।আমাদের অবশ্যি সে ভয় ছিল না....চেনা চত্তর,চেনা পুলিস।। বান্ধবী পকেট থেকে রাম এর নীপ বের করে চুমুক দিল।তারপর আমি.....।আরো এক নীপ.....ভেসে গেল শহর।
অফিসে মদ খেয়ে ঢোকা যাবেনা... আমরা ঝিম ধরে বসে রইলাম রাস্তার পাশে রেলিং এ। রাত বেড়ে চলল।বৃষ্টি একসময় থেমে এল।আমরা উঠে গেলাম ৪ তলায়।
 ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব্বাই ঘুমাচ্ছে।আমার কাজ সৌমিত্রদা প্রায় শেষ করে ফেলেছে।ওর চোখে ঘুম নেই।চোরের মত গুটিগুটি পায়ে ঢুকছি,সোমিত্রদা বলল,চল,  এট্টু চা খেয়ে এবার বসে পড়।আমি প্রায় শেষ করে এনেছি।

তা.....রাম কি সব শেষ??????

Sunday, January 22, 2017

একটা ৬ইঞ্চি পাতলা দেয়াল।তার ঠিক  ওপারেই ওর দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।আমি স্থির চোখে চেয়ে আছি হলদে রংচটা দেয়ালের দিকে।আমার ডানদিকে মাম একবার দেয়ালের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার আমার দিকে।পুর্বা আমার জামা শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাপছে,মাম ওর মুখ চেপে রেখেছে বা হাত দিয়ে।
আমি মাথা না ঘুরিয়ে আড়চোখে বাঁ দিকে দেখে নিলাম ভেতরবাড়ি যাওয়ার দরজায় বান্টিদা দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার ডানদিকে কাঠের দরজার একটা পাল্লা খোলা...চোয়াল শক্ত করে খুব ধীরে মাথা নীচু করে বান্টিদা আমায় ইসারায় ডাকল। আমি নড়লেই আওয়াজ হবে,আর একটু শব্দ হলেই.... প্রায় ১২ ফুট উচু দাতাল মদ্দা পাগলা হাতিটা দরজা আর দেয়ালটা জাস্ট ভেঙে ঢুকে আমাদের পিষে ফেলবে।ওই  পাতলা দেয়াল ওর কাছে পিজবোর্ড এর খেলনার মতই।
রাতের খাওয়ার টেবিলেই বসে শুনছিলাম, কাঠের বাংলোর পেছনের জংগল থেকে এই বিচ্ছিরি রকম বড় দাতালটার চিৎকার। শোনা মাত্রই,আধখাওয়া ডিম ফেলে ক্যামেরা নিয়ে ছুটদিলাম বান্টিদার সাথে, জাস্ট ৩-৪ টে বাড়ি পরে, ফরেস্ট গার্ড এর জঙ্গল  ঘেষাছোট্ট কোয়ার্টারে।ওর বাড়ির পেছনের জঙ্গলেই নাকি হাতিটা কলাগাছ খাচ্ছে,,ব্যাটা জাস্ট দিন দুয়েক আগেই এক বুড়িকে তার ঘর ভেঙে ঢুকে পা দিয়ে থেঁতলে মেরে, চাল খেয়ে পালিয়েছে....বড্ড জ্বালাচ্ছে নাকি এই দাঁতাল!!
এ হেন সু সময়ে আমি আর বসে ডিম খাই কি ভাবে!!
কিন্তুগভীর অন্ধকারে,বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি মাম আর পুর্বা হাত ধরাধরি করে ঠিক আমাদের পেছনেই আসছে..হাতি দেখব,হাতি দেখব,.. বলতে বলতে। আমাদের,, কি আর বলব,,, জাস্ট  গা জ্বলে গেল।কিন্তু তখন আর পেছন ফেরার উপায় নেই,চারদিকেই তো জংগল,...
  ওদের নিয়েই,পায়ে পায়ে ওই  নির্দিষ্ট কোয়ার্টার এর পেছনের উঠোনে পৌছে গেলাম।উঠোনের ওপারেই ঘন জংগল।ওইখান থেকেই মসমস শব্দ ভেসে আসছে....কেউ একটা যেন ফুঁসসছে রাগে...
 ওই ফরেস্ট গার্ড আমাদের দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগার!!উঠোনের দিকের দরজা বন্ধ রেখে জানলা একপাটি খুলে উনি উকি মারছেন। হাত দিয়ে ইসারায় উঠোনে হাতি পালান পালান.বলার চেষ্টা ... খুব সন্তর্পনে একপাটি দরজা একটু ফাক করে খুলে হাত দিয়ে দ্রুত ইসারায় ভেতরে চলে আসতে বললেন। আমরা দ্রুত দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই টের পেলাম পেছনে কালাপাহাড় তেড়ে আসছে ঝোপঝাড় ভেঙে!!!!!  আমরা ঘরে ঢুকেই বাঁ দিকেই দাঁড়িয়ে পড়লাম হতভম্বের মত!! বান্টিদা এক দৌড়ে ভেতরঘরের দরজা দিয়ে ভেতর বাড়িতে চলে গেল গার্ডের সাথে।আর ওই কালাপাহাড় এসে দেয়ালের ওপারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর পা দিয়ে মাটি ঘষতে লাগল ক্রমাগত....
আমরা ঘরে ঢুকে, বাঁ দিকে গিয়েই,পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম...... বুঝলাম,বিচ্ছিরি এক ভুল করে বসেছি!! এবার আর কি....স্টাচু হয়ে থাক আর কি!!!
এক একটা মিনিট মনে হচ্ছে এক বছর....
৬ ইঞ্চি দেয়ালের ওপারেই মৃত্যু!!!  আর এপারে আমরা ৩ জন আর খান ২০০ মশা!!
এভাবে হাতিটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে পড়ল বোধহয়... আমার দিকে ২০০ মশা হলে ওই ব্যাটার দিকে তো হাজার খানেক হবেই...আর সে  সব রাক্ষুসে মশা...হুল ফুটিয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে সমানে...
আর তা ছাড়া,দেয়ালের আড়ালে থাকাতে ও ব্যাটা কিছুতেই আমাদের দেখতেও পাচ্ছে না, আর সাড়া শব্দ না পেয়ে আরও বিরক্ত.... কিন্তু বিরাট ভাগ্য যে গত দিনের মত ওনার দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হয়নি....বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর,একবার  জাস্ট ভীষণ  জোরে হুংকার দিল ।মাম এবার কেপে  চিৎকার দিয়ে উঠল,সাথে পুর্বাও......।আর প্রায় সাথে সাথেই  আমি মাম আর পুর্বাকে দুহাতে চেপে ধরে এক ছুট দিলাম ভেতরবাড়িরর সদর দরজার দিকে....যাওয়ার সময় এক ঝলক ডানদিকে তাকিয়ে,পাতলা কাঠের হাফ খোলা দরজার ওপারে অন্ধকার জংগলের মাঝে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় দুটো লাল বিন্দু জ্বলতে দেখলাম।।প্রবল জোরে মাথা ঝাকিয়ে উঠল সে...আবার এক চিৎকারে রাতের বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট কেপে উঠল!!!
তারপর দেখি আস্তে আস্তে ধুলোর ঝড় তুলে, রাতের অন্ধকারে,গভীর  জংগলে মিলিয়ে গেল দাতালটা।
#পুনশ্চ : এই পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে মিনিট ৫ এর মধ্যে....আর পুরোটাই আমার ক্যামেরা বন্দী করা আছে !!!  অনেকেই দেখেছে ভিডিওটি!! কিন্তু আমাদের তখন মনে হয়েছিল বোধহয় ঘন্টা খানেক ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
কিন্তু ওখানেই শেষ নয়....হাতি শেষ রাতে আবার ফিরে এসেছিল আমাদের কাঠের বাংলোর নীচে দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্প করে গেছে....
তখনও আমি বাইরে........হাতির পেছনে....ক্যামেরা হাতে!!!!
তবে মাঝরাতে ফিরে এসে ওই আধ খাওয়া ডিম টা কিন্ত আর খুজে পাইনি কোথাও!!

Monday, January 9, 2017

বিকেলবেলাটা যখন সন্ধের দিকে হেলে গেল,আমাদের কাচের টেবিলের ওপর চারটে কফির কাপ দিয়ে চলেগেল নস্যি রঙের পোশাক পরা বেয়ারা।আমি চেয়ার নিয়ে বাকীদের দিকে পেছন ফিরে জঙ্গলের দিকে মুখ করে ক্যামেরা নিয়ে বসে আছি।বিন বিন করছে মশা...আস্তে আস্তে জমাট বাধছে অন্ধকার।
কফির কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে  গিয়েই থমকে গেলাম।যে উঁচু সিমেন্ট বাধানো চাতালে এই ক্যাফেটেরিয়াটা,তার চারদিকেই বড় বড় গাছ, আর সেই একটা গাছের নীচেই আমার কফির কাপটার দিকে একদৃষ্টে সোজা তাকিয়ে একটা হায়না জিভ চাটছে।আমিও যথেষ্ট ঘাবড়ে গিয়ে  কফির কাপটা আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলাম। বাজুদা,বুলকিদি,মাম সব্বাই দেখি নিজেদের মত গপ্পো করে চলছে।ছোট্ট পুর্বা টেবিলের ওপরই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি বেয়ারাটাকে ডাকার চেষ্টা করে, গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না।হায়নাতো মাংশাসী বলেই জানি।মশা তাড়াবার মত করে হুশ হুশ করলাম কয়েকবার....হাতের ক্যামেরাটাও ছোড়ার ভঙ্গী করলাম....কিসের কি!! ও শালা মুচকি মুচকি হাসছে....বাকীরা এত কথা বলতে পারে কেন,কে জানে...ঘাড়ের ওপর ডাইনোসর নিশ্বাস ফেলছে !! ওরে...এদিকে দ্যাখরে একবার...বাকীদের দৃষ্টি আকর্ষন করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি।তখন ডিজাইনার শাড়ি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে... মাম বার দুয়েক টেবিল ও চাপড়াল দেখি।হায়নাটা একবারের জন্য ওদিকে তাকিয়ে আবার আমার চোখে চোখ রাখল!!জ্বলন্ত চোখ!!
আমি যেহেতু ফেস টু ফেস... আমিই টার্গেট। ব্যাটা ঠিককোনদিকে  লাফটা দেবে তাই মন দিয়ে হিসেব কষছি আর প্রমাদ গুনছি।
হঠাত কানহা অভয়ারণ্যর আকাশ বাতাস চিরে দৈববাণীর মত শোনা গেল,... "দক্ষিনাপনের খাদিটাই সবথেকে ভাল..."............
আশেপাশের গাছ থেকে দু একটা পাখি অজানা আশংকায়, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল।
পুর্বা ঘুম থেকে উঠে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল।
হায়নাটা অত্যন্ত অবাক হয়ে একবার দৈববানীর উৎসের দিকে তাকাল... তারপর আমার দিকে ফিরল...এবার আমি ওর চোখে করুনা দেখতে পেলাম।  হায়না এবার মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে পেছন ফিরে  গভীর অরন্যের দিকে চলেগেল।
আমি  এবার হাফ ছেড়ে কফির কাপটা তুলে নিলাম।
মাম এতক্ষনে একটু ফাঁক পেয়ে আমার টেবিলের দিকে ফিরে খেঁচিয়ে উঠল, কি ব্যাপার!! কোল্ড কফি করে খাবে নাকি!!

#খাওয়া না খাওয়ার খেলা, যদি চলত এই বিকেলবেলা...
হঠাত কি ঘটে যেত.... কিসসু বলা যায় না !!