Wednesday, July 26, 2017

ভয়ে ভয়ে ভুটানঘাট


ভুটানঘাট পাহাড়  বক্সার গভীর জংগলের শেষপ্রান্তে।ভর সন্ধেবেলায় ওই জংগলে ঢোকা অত্যন্তই বাড়াবাড়ি বলে ধরা হয়।অ্যাকচুয়ালি জনমানবশূন্য বক্সার অরন্যের এই প্রান্তে যে কোন সময়েই ঢোকা একটু বাড়াবাড়ি.... 
বাড়াবাড়ি মানে,বুঝতে পারলাম,যখন ফরেস্ট রেঞ্জার  চোখ কপালে তুলে ছোটমামার মুখের দিকে অনেকক্ষণ হা করে তাকিয়ে থেকে শেষে মুখটা যতটা সম্ভব সিরিয়াস করে গম্ভীর গলায় বললেন,আপনি জানেন... এই জংগলে লেপার্ডের অত্যাচার কিরকম বেড়ে গেছে?
ছোটমামা অম্লানবদনে উত্তর দিলেন,সেটা কি আমার জানার কথা,!রেঞ্জার এবার আমার,মামের আর পুষার মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্তই বিরক্ত মুখে খেচিয়ে উঠলেন, আরে মশাই আমরাই এই সন্ধের মুখে ওই জংগলের রাস্তা মাড়াই না,আর আপনি এই মহিলাদের নিয়ে.....!!তা ছাড়া,এটা হাতিদের বের হবার সময়.... 
ছোটমামা অম্নানবদনে বললেন,আমি তা হলে ডি.এফ.ডি কে.......

রেঞ্জার মুখ ফিরিয়ে নেপালি এক ফরেস্ট গার্ড কে ডাক দিলেন বিরক্ত মুখে!
গার্ড এসে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগল।নেপালী ভাষায় রেঞ্জারকে হাত পা নেড়ে তীব্রবেগে কি সব বোঝাবার প্রবল চেষ্টা করল।
পুষা গজগজ করতে করতে মামকে বলল,বউদি তুমি বাবাকে বল না....মাম দেখি খুব একটা পাত্তা দিল না।
একটু পর দেখি ওই গার্ড অত্যন্ত বিরক্ত মুখে পিঠে এক ঢাউস বন্দুক ঝুলিয়ে হেলতে দুলতে চলে এল।
এবার আমার অবাক করার পালা।আমি গার্ডের হাতে পেল্লায় এক ট্রাইপড ধরিয়ে দিয়ে বললাম,এবার বন্দুকটি সরিয়ে এটা নিয়ে চলুন।
বাইক স্টার্ট দিয়ে ওকে পেছনে বসতে ইশারা করলাম।মাম আর পুষা ততক্ষনে ছোটমামার বাইকের পেছনে বসে পড়েছে। সুর্য তখন অস্তগামী।
সামনের ঘন জংগলের রাস্তায় অন্ধকার মিশে গেছে কালচে সবুজে।গাছে গাছে বানরের কান ফাটানো আর্তনাদ,  আমরা এগিয়ে চলেছি সরু রাস্তা দিয়ে,দুপাশে ঘন অন্ধকার অরন্য।বাইকের হেডলাইট জালিয়ে দিতে হল।পড়ন্ত বিকেলের অল্প আলোয়, গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে গাঢ় নীল ভুটান পাহাড়ের রেখা।
আমার পেছন থেকে গার্ড মশাই ক্রমাগত বলে চলেছেন,দাদা এই সময় আমরা কক্ষনও এদিকে আসিনা...এখন বাঘ জল খেতে আসে তো!! হাতির পাল নেমে আসে ভুটান পাহাড় থেকে।
আমার হাতটা একটু কেপে গেল এটা শুনে!!!কাঁপবেই না কেন রে বাবা!!!
ভালয় ভালয় এই শ্বাপদশঙ্কুল শ্যুটিং শেষ হলে হয়!!! 
বেশ কিছুদুর জংগল পার হবার পর একটা মড়া নদীর বালির চর পার হলাম।ওপারেও ঘন জংগল।বা দিকে দেখতে পেলাম নদীর চরার ওপর একটা ভাঙ্গা ব্রিজ। গার্ড বাবু শীতকালে বাতাস করার মত দৈববাণী করলেন,ওপারের জঙ্গলে আলফা জঙ্গিদের ডেরা,ওই ব্রিজটা ওনারাই বোম দিয়ে একটা আর্মি ট্রাক সমেত উড়িয়ে দিয়েছেন!!
ততক্ষনে আমরা ওপারের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার জঙ্গলে ঢুকে  পরেছি।ঘরে ফেরত পাখিদের ডাকও এখন থেমে গিয়ে শুধু রাক্ষুসে ঝিঝির ডাক,আর অজানা জন্তুজানোয়ারের অদ্ভুত সব ডাক,যা জন্মেও শুনিনি।ফুট দুয়েক চওড়া বালি পাথর ছড়ান রাস্তায় দুপাশেই ঝুকে পড়ছে ঝোপঝাড়। ছোটমামা চোয়াল শক্ত করে স্থির চোখে রাস্তায় চোখ রেখে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে ধরে আছেন।রাস্তা সমানে বাক নিয়েই চলেছে....আসলে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের এখন খুব একটা উপায়ও নেই!!কারন ফিরতে হলেও এই ঘন জঙ্গল দিয়েই অন্ধকার ভেদ করে ফিরতে হবে, ভুটানঘাট নাদেখেই....অগত্যা।
আমরা জাস্ট দম আটকে এগিয়ে চলেছি বক্সার ভুটানঘাট পাহাড়ের প্রান্তে।অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসছে!!

No comments:

Post a Comment