Wednesday, July 26, 2017

চিত্রকথা ২

খুব বৃষ্টির মধ্যে কখনও গভীর জংগলে গিয়ে দাড়িয়েছেন?চারদিকে ঝাপসা হয়ে যাওয়া সবুজ গলে গলে নেমে আসে  খয়েরী গাছের গা বেয়ে বেয়ে। হাওয়ার আওয়াজ প্রথমে শোনাই যায় না!কিছু শুকনো পাতায় প্রথম বৃষ্টির আওয়াজ ,তারপর ঝুপ ঝুপ করে একঘেয়ে পড়তে থেকে অনবরত।বড় বড় ঘাসগুলোর ফাঁক দিয়ে জলস্রোত একেবেকে যেতে যেতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।একটু দূর থেকেই বোধহয় ছোট জলস্রোতের শব্দ পাওয়া যায়,বোধহয় কোন ফ্লগু নদীরই হবে!এদিক ওদিক তাকিয়েও কোথাও চোখে পড়ে না কোন নদীর স্রোত।খালি পেছনে বাঁদিকে গাঢ় সবুজ,একটু দূর গেলেই কালো হয়ে আছে।আকাশ ঘোর অন্ধকার।বৃষ্টির বেগ বাড়লো বোধহয়।সামনে ডানদিকে ঘাসবন ছাপিয়ে নেমে গেছে  ঢালু পাড়,বেশ খানিকটা, তারপর বিদ্যুতের ফেনসিং।বেশ কিছুটা দূরে চোখে পড়ে সল্ট পিট।এই ঘোর বৃষ্টিতেও কয়েকটা বাইসন সাদা মোজা পায়ে নুন চাটছে একা একা।চারদিক ঘন অরণ্য অন্ধকার। 
ডানদিকে বিশাল বাংলো দাঁড়িয়ে আছে। বা দিকে নজরমিনার।বৃষ্টি টিপ টিপ।
আমরা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জিপ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ি।ভিজতেই থাকি অনবরত।ট্রাইপডে রাখা ক্যামেরাও ভিজতে থাকে। যা থাকে কপালে !!অভিষেক দৌড়ে চলে যায় বৃষ্টির মধ্যেই  জংগলের দিকে  অনেক দূর।ওর হাফ প্যান্ট পড়া পা দুটো কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়।মৈনাক গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা গাছের নীচে।আমিও জিপ চলা রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর দিয়ে হাটতে থাকি একা একা।একটু পরেই মাথা নীচু করে চোখে পড়ে, আমি আর একা নই, আমার সাথে গোটা ৩নেক জোঁকও হাটছে আমার পায়ে চেপে!!
একদৌড়ে চলে যাই নজরমিনারের দিকে।আমার পেছন পেছন মৈনাক,আর অভিষেক।নজরমিনারটি প্রায় তিনতলা বাড়ির সমান উচু।
ওপরে উঠে গেলে,বহুদুর অরণ্য চোখে পড়ে।বিরাট গাছগুলোর পেছনে হালকা নীল ভুটান পাহাড়। অঝোর বৃষ্টিতে প্রায় ঝাপসা 
অতদুর চোখ যায় না।নাকি চালসে পরছে চোখে,কে জানে?
ক্যামেরা নিয়ে বোকার মত তুলতে থাকি  এই বৃষ্টি ভেজা জংগল,যদিও জানি,এই অনাঘ্রাত অরন্য আর ঝিম ধরা বৃষ্টি র ঘোর, বন্দী করার হ্মমতা এই নির্বোধ ক্যামেরার নেই। 

কাঠের ঘোরান সিঁড়ি বেয়ে মচমচ শব্দ করে উঠে আসি বাংলোর দোতলায়, ভেজা রেলিং এ হাত রাখি। ততহ্মনে রেঞ্জার বাবুর সৌজন্যে গরম চা চলে এসেছে।সাথে মেরি বিস্কুট। 
ওদিকে, বাইসনের পাল ও দল ভারী হয়েছে।চার জন থেকে এখন দশ বারো জনহবে।   বৃষ্টি কিন্তু হয়েই চলেছে ক্রমাগত। 
আমার পায়ে ইতিমধ্যে খান তিনেক ফুটো হয়ে,রক্ত ঝরছে সমানে।
বাংলোর কেয়ারটেকার, সুতীর কাপড় পুড়িয়ে নিয়ে এলেন।তার ছাই, নিজের হাত দিয়েই লাগিয়ে দিলেন ওই জোক আক্রমনের হ্মত স্থানে।এটা জংগলমহলের টোটকা। 
অভিষেক খাস  দক্ষিণ কোলকাতার,গড়িয়ার ছেলে।,জোক তো দূরে থাক,কেচো অবধি দ্যাখেনি! ওই সব দেখে,প্রথমে বেশ খানিকটা আনন্দ পেলো,তারপর  ওই রক্ত ফক্ত দেখে,একটু ঘাবড়ে গেল।শেষে বিষম ভয় পেয়ে খানকতক মেরি বিস্কুট খেয়ে,দোতলার বারান্দার এক কোনার চেয়ারে গিয়ে বসে রইল।
মৈনাক পেশাগত ভাবে সাউন্ড ডিজাইনার হলেও আমার কাজের হ্মেত্রে মডেল হিসেবে কাজ করছে।সারাহ্মন ধরে ছোট্ট একটা ফাউন্ডেশন কিট আর আয়না নিয়ে ৫ মিনিট পর পর মুখ দেখে বেড়াচ্ছিল।আমার ওই পরিমান রক্তপাত দেখে,ঘামতে ঘামতে,ওর মেক আপ গলে ভুত। ফ্যাকাসে মুখ করে বলল,"ইয়ে দাদা, আমি আর ওই জংগলে যাচ্ছি না।আজকের মত প্লিজ প্যাক আপ কর।"
আমি ব্যাজার মুখে বসে রইলাম।বৃষ্টি র বেগ আর ও বাড়ল। ঘোর বর্ষা চলছে,তার মধ্যেই ৭-১০ দিন ধরে, এই শ্যুটিং। গভীর থেকে গভীরতম অরণ্যে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। পাহাড় থেকে জংগল, বৃষ্টি তে চরে বেড়াচ্ছি, অনেকটা রাস্তা হারানো ছাড়া গরুর মত।
চাপড়ামারি অভয়ারণ্য মানুষের পায়ে হেটে চলার জন্য একদমই নয়।
পেটের দায়ে অনেককে অনেক কাজে নামতে হয়,আমরা তো শুধু হাতি,চিতাবাঘ,জোক,সাপ, ভালুক,নেকেড়ে,হায়না( দু চারটে ভ্যাম্পায়ার ও থাকতে পারে,আমরা আর কতটুকুই বা জানি!!) ভরা বৃষ্টি ভেজা অরন্যে এক রাম ভীতু মডেল,আর ও ভীতু  কলকাত্তাই সহকারী পরিচালক, (আর বাকী টিম মেম্বার দের কথা আর বললামই না,কারন তারা জিপ থেকেই নামেনি!!!) দের নিয়ে ৩- ৪ মাস ধরে এই তথ্যচিত্র তুলছি।পশ্চিমবাংলার উত্তরাঞ্চলের বেশকিছু অরণ্য চরে বেড়ানোর সুবাদে,বর্ষায় সবুজের রঙ মিলাচ্ছি। ক্যামেরায় উঠছে সামান্যই, মনে থেকে যাচ্ছে অনেকটাই।কিন্তু  আজ বোধহয় শ্যুটিং বন্ধ হল।এই বৃষ্টি আজ আর থামবেনা।ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধ্যা। আকাশে মেঘ থাকায়,আরো অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ।মাঝে মাঝে নাম না জানা পাখি উড়ে চলে যাচ্ছে বাঁ দিক থেকে ডান দিকের গভীরতম অরণ্যে।ঝিঝির এক ঘেয়ে ডাকে দু চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।মৈনাক আর অভিষেক কাঠের বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে বসে জাস্ট ঘুমিয়ে পড়ল।বাইসন গুনতে গুনতে আমারও চোখ বুজে এল।

ওখান থেকে আমরা চলে গেলাম গরুমারার দিকে।সে অবশ্য অন্য গপ্পো। 

বৃষ্টি ভেজা অরণ্য ভ্রমণ, এত সমস্যা হলেও,অপুর্ব এক দৃশ্যপটের জন্ম দেয়।বর্ষায় যদিও জংগল বন্ধ থাকে,তবুও বাফার জোন বা জংগল আর লোকালয়ের মধ্যবর্তী এলাকায় ঘোরার অনুমতি মেলে।সেখানে পালে পালে জোক নেই,জন্তুজানোয়ারের অত্যাচার নেই।নিশ্চিন্তে একটি ছাতা নিয়ে জংগলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকুন চুপচাপ

No comments:

Post a Comment