Friday, January 27, 2017

।।কল কথা।।
     পর্ব-৬

আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি। অফিসের সামনের রাস্তায় জল জমছে আস্তে আস্তে।আমার টেবিলের বাঁ দিকে ছোট্ট জানলা। চারতলার নীচে ছোট্ট এক ফালি জমি,পাচিল, তার পরই চওড়া রাস্তা চলে গেছে ম্যাক্সমুলারের সামনে দিয়ে।বৃষ্টির বেগ বাড়াতে কাচ ঝাপসা হয়ে এল।আমি মিন্টো পার্কের বৃষ্টি দেখব বলে,বিজনদার ক্যান্টিনে ছুট দিলাম।তখন ভয়াবহ কাজের চাপ,রাত প্রায় ১টা বাজে।চ্যানেল আইডি র কাজ চলছে।দেবাদা ঠায় বসে রয়েছেন এক প্রান্তে।। চ্যানেল হেড এলে সাধারণত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ানই ভদ্রতা....কিন্তু দেবাদা এলে কারো খেয়াল ই হত না, কে এল কে গেল....অসম্ভব ভাল এক মানুষ। কাজেরও।
আর এই দেবাদা আমাদের মাথা।খুব একটা নিয়ম কানুন চাপিয়ে দেবার লোক নয়...আমরাও সুযোগে খ্যাপামি করতাম তেড়ে।
ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি,মধ্যরাত ,দুজন বসে চুটিয়ে প্রেম করছে,জানলা খুলে বৃষ্টি দেখব বললে,জাস্ট ক্যেলিয়েই দেবে।নামটা বলব না....এখন ওনারা প্রতিষ্টিত।তবে কি প্রতিষ্ঠিতরা প্রেম করে না!! করেই তো,প্রাতিষ্ঠানিক প্রেম।আর আমি বলছি গোপন প্রেম!!
ছিটকে ফিরে এলাম।প্যাসেজে ঘুরঘুর করছি...আকাশে তখন সুন্দরীর ছড়াছড়ি।. হঠাত বান্ধবীর  সাথে দেখা।
প্যাকেট দেখিয়ে বলল,চল,ফুকে আসি।
আমি বললাম,যাচ্ছি,বাট বৃষ্টিতে ভিজে  নীচে জল দেখতে যাব। রাস্তার ওপারে...
...আমরা পুরনো অন্ধকার সিড়ি বেয়ে নেমে এলাম।স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলার দেয়াল বেয়ে জল নামছে।নিকষ অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে, ঘুলঘুলি দিয়ে আলোয় পরের ধাপ গুলো আন্দাজ করছি।
বাইরে ঝমারে বৃষ্টি হয়েই চলছে।আমরা সিগারেট ধরিয়ে হেটে চললাম.... বেগবাগান জলে ডুব।শুনশান মধ্যরাত।সাদা হয়ে আসছে,ঝাপসা হলুদ বৃষ্টি রাত।সিগারেট ভেসে গেল। ওভারব্রিজের নীচে দাড়ালাম।সাদা লা মার্টিন এর বাড়িটা আউট ওফ ফোকাস। মাথায় ঘুরছে সৌমিত্রদার স্কেচ গুলো।মধ্যরাত পার করে সৌরভদা রা টলোমলো পায়ে ফেরে,এই রাস্তাতেই,বাস না পেলে...পায়ে হেটে,পুলিশ বাচিয়ে।আমাদের অবশ্যি সে ভয় ছিল না....চেনা চত্তর,চেনা পুলিস।। বান্ধবী পকেট থেকে রাম এর নীপ বের করে চুমুক দিল।তারপর আমি.....।আরো এক নীপ.....ভেসে গেল শহর।
অফিসে মদ খেয়ে ঢোকা যাবেনা... আমরা ঝিম ধরে বসে রইলাম রাস্তার পাশে রেলিং এ। রাত বেড়ে চলল।বৃষ্টি একসময় থেমে এল।আমরা উঠে গেলাম ৪ তলায়।
 ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব্বাই ঘুমাচ্ছে।আমার কাজ সৌমিত্রদা প্রায় শেষ করে ফেলেছে।ওর চোখে ঘুম নেই।চোরের মত গুটিগুটি পায়ে ঢুকছি,সোমিত্রদা বলল,চল,  এট্টু চা খেয়ে এবার বসে পড়।আমি প্রায় শেষ করে এনেছি।

তা.....রাম কি সব শেষ??????

Sunday, January 22, 2017

একটা ৬ইঞ্চি পাতলা দেয়াল।তার ঠিক  ওপারেই ওর দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।আমি স্থির চোখে চেয়ে আছি হলদে রংচটা দেয়ালের দিকে।আমার ডানদিকে মাম একবার দেয়ালের দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার আমার দিকে।পুর্বা আমার জামা শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাপছে,মাম ওর মুখ চেপে রেখেছে বা হাত দিয়ে।
আমি মাথা না ঘুরিয়ে আড়চোখে বাঁ দিকে দেখে নিলাম ভেতরবাড়ি যাওয়ার দরজায় বান্টিদা দাঁড়িয়ে আছে। আর আমার ডানদিকে কাঠের দরজার একটা পাল্লা খোলা...চোয়াল শক্ত করে খুব ধীরে মাথা নীচু করে বান্টিদা আমায় ইসারায় ডাকল। আমি নড়লেই আওয়াজ হবে,আর একটু শব্দ হলেই.... প্রায় ১২ ফুট উচু দাতাল মদ্দা পাগলা হাতিটা দরজা আর দেয়ালটা জাস্ট ভেঙে ঢুকে আমাদের পিষে ফেলবে।ওই  পাতলা দেয়াল ওর কাছে পিজবোর্ড এর খেলনার মতই।
রাতের খাওয়ার টেবিলেই বসে শুনছিলাম, কাঠের বাংলোর পেছনের জংগল থেকে এই বিচ্ছিরি রকম বড় দাতালটার চিৎকার। শোনা মাত্রই,আধখাওয়া ডিম ফেলে ক্যামেরা নিয়ে ছুটদিলাম বান্টিদার সাথে, জাস্ট ৩-৪ টে বাড়ি পরে, ফরেস্ট গার্ড এর জঙ্গল  ঘেষাছোট্ট কোয়ার্টারে।ওর বাড়ির পেছনের জঙ্গলেই নাকি হাতিটা কলাগাছ খাচ্ছে,,ব্যাটা জাস্ট দিন দুয়েক আগেই এক বুড়িকে তার ঘর ভেঙে ঢুকে পা দিয়ে থেঁতলে মেরে, চাল খেয়ে পালিয়েছে....বড্ড জ্বালাচ্ছে নাকি এই দাঁতাল!!
এ হেন সু সময়ে আমি আর বসে ডিম খাই কি ভাবে!!
কিন্তুগভীর অন্ধকারে,বেশ কিছুদুর যাওয়ার পর দেখি মাম আর পুর্বা হাত ধরাধরি করে ঠিক আমাদের পেছনেই আসছে..হাতি দেখব,হাতি দেখব,.. বলতে বলতে। আমাদের,, কি আর বলব,,, জাস্ট  গা জ্বলে গেল।কিন্তু তখন আর পেছন ফেরার উপায় নেই,চারদিকেই তো জংগল,...
  ওদের নিয়েই,পায়ে পায়ে ওই  নির্দিষ্ট কোয়ার্টার এর পেছনের উঠোনে পৌছে গেলাম।উঠোনের ওপারেই ঘন জংগল।ওইখান থেকেই মসমস শব্দ ভেসে আসছে....কেউ একটা যেন ফুঁসসছে রাগে...
 ওই ফরেস্ট গার্ড আমাদের দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগার!!উঠোনের দিকের দরজা বন্ধ রেখে জানলা একপাটি খুলে উনি উকি মারছেন। হাত দিয়ে ইসারায় উঠোনে হাতি পালান পালান.বলার চেষ্টা ... খুব সন্তর্পনে একপাটি দরজা একটু ফাক করে খুলে হাত দিয়ে দ্রুত ইসারায় ভেতরে চলে আসতে বললেন। আমরা দ্রুত দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই টের পেলাম পেছনে কালাপাহাড় তেড়ে আসছে ঝোপঝাড় ভেঙে!!!!!  আমরা ঘরে ঢুকেই বাঁ দিকেই দাঁড়িয়ে পড়লাম হতভম্বের মত!! বান্টিদা এক দৌড়ে ভেতরঘরের দরজা দিয়ে ভেতর বাড়িতে চলে গেল গার্ডের সাথে।আর ওই কালাপাহাড় এসে দেয়ালের ওপারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর পা দিয়ে মাটি ঘষতে লাগল ক্রমাগত....
আমরা ঘরে ঢুকে, বাঁ দিকে গিয়েই,পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম...... বুঝলাম,বিচ্ছিরি এক ভুল করে বসেছি!! এবার আর কি....স্টাচু হয়ে থাক আর কি!!!
এক একটা মিনিট মনে হচ্ছে এক বছর....
৬ ইঞ্চি দেয়ালের ওপারেই মৃত্যু!!!  আর এপারে আমরা ৩ জন আর খান ২০০ মশা!!
এভাবে হাতিটাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে পড়ল বোধহয়... আমার দিকে ২০০ মশা হলে ওই ব্যাটার দিকে তো হাজার খানেক হবেই...আর সে  সব রাক্ষুসে মশা...হুল ফুটিয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে সমানে...
আর তা ছাড়া,দেয়ালের আড়ালে থাকাতে ও ব্যাটা কিছুতেই আমাদের দেখতেও পাচ্ছে না, আর সাড়া শব্দ না পেয়ে আরও বিরক্ত.... কিন্তু বিরাট ভাগ্য যে গত দিনের মত ওনার দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হয়নি....বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর,একবার  জাস্ট ভীষণ  জোরে হুংকার দিল ।মাম এবার কেপে  চিৎকার দিয়ে উঠল,সাথে পুর্বাও......।আর প্রায় সাথে সাথেই  আমি মাম আর পুর্বাকে দুহাতে চেপে ধরে এক ছুট দিলাম ভেতরবাড়িরর সদর দরজার দিকে....যাওয়ার সময় এক ঝলক ডানদিকে তাকিয়ে,পাতলা কাঠের হাফ খোলা দরজার ওপারে অন্ধকার জংগলের মাঝে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় দুটো লাল বিন্দু জ্বলতে দেখলাম।।প্রবল জোরে মাথা ঝাকিয়ে উঠল সে...আবার এক চিৎকারে রাতের বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট কেপে উঠল!!!
তারপর দেখি আস্তে আস্তে ধুলোর ঝড় তুলে, রাতের অন্ধকারে,গভীর  জংগলে মিলিয়ে গেল দাতালটা।
#পুনশ্চ : এই পুরো ব্যাপারটা ঘটেছে মিনিট ৫ এর মধ্যে....আর পুরোটাই আমার ক্যামেরা বন্দী করা আছে !!!  অনেকেই দেখেছে ভিডিওটি!! কিন্তু আমাদের তখন মনে হয়েছিল বোধহয় ঘন্টা খানেক ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
কিন্তু ওখানেই শেষ নয়....হাতি শেষ রাতে আবার ফিরে এসেছিল আমাদের কাঠের বাংলোর নীচে দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্প করে গেছে....
তখনও আমি বাইরে........হাতির পেছনে....ক্যামেরা হাতে!!!!
তবে মাঝরাতে ফিরে এসে ওই আধ খাওয়া ডিম টা কিন্ত আর খুজে পাইনি কোথাও!!

Monday, January 9, 2017

বিকেলবেলাটা যখন সন্ধের দিকে হেলে গেল,আমাদের কাচের টেবিলের ওপর চারটে কফির কাপ দিয়ে চলেগেল নস্যি রঙের পোশাক পরা বেয়ারা।আমি চেয়ার নিয়ে বাকীদের দিকে পেছন ফিরে জঙ্গলের দিকে মুখ করে ক্যামেরা নিয়ে বসে আছি।বিন বিন করছে মশা...আস্তে আস্তে জমাট বাধছে অন্ধকার।
কফির কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে  গিয়েই থমকে গেলাম।যে উঁচু সিমেন্ট বাধানো চাতালে এই ক্যাফেটেরিয়াটা,তার চারদিকেই বড় বড় গাছ, আর সেই একটা গাছের নীচেই আমার কফির কাপটার দিকে একদৃষ্টে সোজা তাকিয়ে একটা হায়না জিভ চাটছে।আমিও যথেষ্ট ঘাবড়ে গিয়ে  কফির কাপটা আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলাম। বাজুদা,বুলকিদি,মাম সব্বাই দেখি নিজেদের মত গপ্পো করে চলছে।ছোট্ট পুর্বা টেবিলের ওপরই ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি বেয়ারাটাকে ডাকার চেষ্টা করে, গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না।হায়নাতো মাংশাসী বলেই জানি।মশা তাড়াবার মত করে হুশ হুশ করলাম কয়েকবার....হাতের ক্যামেরাটাও ছোড়ার ভঙ্গী করলাম....কিসের কি!! ও শালা মুচকি মুচকি হাসছে....বাকীরা এত কথা বলতে পারে কেন,কে জানে...ঘাড়ের ওপর ডাইনোসর নিশ্বাস ফেলছে !! ওরে...এদিকে দ্যাখরে একবার...বাকীদের দৃষ্টি আকর্ষন করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি।তখন ডিজাইনার শাড়ি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে... মাম বার দুয়েক টেবিল ও চাপড়াল দেখি।হায়নাটা একবারের জন্য ওদিকে তাকিয়ে আবার আমার চোখে চোখ রাখল!!জ্বলন্ত চোখ!!
আমি যেহেতু ফেস টু ফেস... আমিই টার্গেট। ব্যাটা ঠিককোনদিকে  লাফটা দেবে তাই মন দিয়ে হিসেব কষছি আর প্রমাদ গুনছি।
হঠাত কানহা অভয়ারণ্যর আকাশ বাতাস চিরে দৈববাণীর মত শোনা গেল,... "দক্ষিনাপনের খাদিটাই সবথেকে ভাল..."............
আশেপাশের গাছ থেকে দু একটা পাখি অজানা আশংকায়, ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল।
পুর্বা ঘুম থেকে উঠে ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল।
হায়নাটা অত্যন্ত অবাক হয়ে একবার দৈববানীর উৎসের দিকে তাকাল... তারপর আমার দিকে ফিরল...এবার আমি ওর চোখে করুনা দেখতে পেলাম।  হায়না এবার মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে পেছন ফিরে  গভীর অরন্যের দিকে চলেগেল।
আমি  এবার হাফ ছেড়ে কফির কাপটা তুলে নিলাম।
মাম এতক্ষনে একটু ফাঁক পেয়ে আমার টেবিলের দিকে ফিরে খেঁচিয়ে উঠল, কি ব্যাপার!! কোল্ড কফি করে খাবে নাকি!!

#খাওয়া না খাওয়ার খেলা, যদি চলত এই বিকেলবেলা...
হঠাত কি ঘটে যেত.... কিসসু বলা যায় না !!